মোঃ শাহজাহান বাশার
ঢাকা: ৩৭২ দিনের বন্দিজীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ঢাকার সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবন থেকে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁর ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোকেও। আদালতে হাজির করার পর খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে সংসদ ভবন এলাকার একটি ভবনকে বিশেষ কারাগার হিসেবে ব্যবহার করে সেখানে তাঁকে রাখা হয়।
দীর্ঘ এক বছর আট দিনের বন্দিজীবনের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চারটি দুর্নীতি মামলায় জামিন পাওয়ার পর মুক্তি পান খালেদা জিয়া। সেদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনি বিশেষ কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁর মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। হাজারো মানুষ তাঁকে স্বাগত জানাতে রাস্তায় নেমে আসেন।
মুক্তির পর খালেদা জিয়া প্রথমে তাঁর প্রয়াত স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করেন। সেখানে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও সমর্থক তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। পরে তাঁর গাড়িবহরকে ঘিরে সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়।
কারামুক্তির পর সেদিনই খালেদা জিয়া রাজনৈতিক সংলাপে অংশ নেওয়া এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারও তাঁর মুক্তিকে রাজনৈতিক সংকট নিরসন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তী সময়ে আরও দুই দফায় সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ, সরকারবিরোধী আন্দোলন, রাজনৈতিক সংঘাত এবং বিভিন্ন সময়ে কারাবাস—সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
২০০৮ সালের সেই কারামুক্তির পরও তাঁর রাজনৈতিক পথচলায় নানা উত্থান-পতন এসেছে। পরবর্তী সময়ে তিনি আবারও কারাবন্দি হন এবং দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক ও শারীরিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবন কাটান।
এরপর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৮০ বছর বয়সে মারা যান বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সও তাঁর মৃত্যুকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মৃত্যুর পর তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমবেত হন। তাঁর জানাজায়ও ব্যাপক জনসমাগম হয়। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, কারাবাস এবং তাঁর মুক্তিকে ঘিরে জনসম্পৃক্ততা একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই মুক্তির দিনটি তাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে আজও আলোচিত।