কুমিল্লার প্রতিনিধি
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল ইউনিয়ন কালিকাপুর বাজারে অবস্থিত কালিকাপুর আব্দুল মতিন খসরু সরকারি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে স্থাপিত প্রতিষ্ঠাতার ছবি ভাঙচুরের ঘটনা এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনা রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকে গুরুত্ব বহন করছে।
স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ চেয়ারম্যান বলেন, “সময়ই সবকিছুর বিচার করবে। হয়তো কোনো একদিন এই ভাঙা ছবিই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে জাদুঘরে স্থান পাবে।”
সাজ্জাদ চেয়ারম্যান আরও জানান, কলেজটি তিনি প্রায় তিন একর ৬৪ শতক জমি নিজ নামে এবং প্রয়াত সাবেক আইনমন্ত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন খসরুর নামে ক্রয় করে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, এটি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্বার্থে নয়, বরং বাকশিমুল ইউনিয়ন, কালিকাপুর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার শিক্ষার উন্নয়ন এবং একজন আদর্শিক নেতার স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছে।
সরকার পরিবর্তনের পর কলেজের প্রধান ফটকের সামনে স্থাপিত প্রয়াত মন্ত্রী ও প্রতিষ্ঠাতার ছবি ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। সাজ্জাদ চেয়ারম্যান জানান, তিনি দীর্ঘদিন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে বুড়িচং এলাকায় সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি দাবি করেন, সরকারি বরাদ্দ ও ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে কখনো নিজের বা পরিবারের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি; বরং দলীয় সিনিয়র নেতা আব্দুল মতিন খসরুর নামে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তিনি বলেন, “আমি ছাত্র জীবন থেকে রাজনীতি করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে কথা বলি এবং একটি নির্দিষ্ট আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। হয়তো এটাই আমার অপরাধ। তবে যারা ছবি ভাঙচুর করেছে, তাদের ভবিষ্যতে বড় নেতা হওয়ার শুভকামনা রইল, শুধু প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়।”
ছবি সংস্কার না করার বিষয়ে তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন, “সময়ই সবকিছুর বিচার করবে। হয়তো একদিন এই ভাঙা ছবিই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে জাদুঘরে স্থান পাবে।”
এই ঘটনার মাধ্যমে সমাজে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে – কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা প্রয়াত ব্যক্তির স্মৃতিচিহ্নে আঘাত করা কি গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হতে পারে? রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কি ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান ক্ষুণ্ণ হওয়া উচিত? গণতান্ত্রিক সমাজে মতপার্থক্য স্বাভাবিক। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, সমালোচনা থাকতে পারে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক উদ্যোগ বা প্রয়াত ব্যক্তির স্মৃতির প্রতি অসম্মান সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচায়ক নয়।
একটি কলেজ কেবল একটি ভবন নয়; এটি এলাকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার কেন্দ্র। তাই এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে থাকে, এটাই প্রত্যাশা। একইসঙ্গে যেকোনো জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ড জনগণের মূল্যায়নের আওতায় থাকবে; এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। উন্নয়ন, সম্পদের ব্যবহার, প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা ব্যবস্থাপনা সবকিছুই স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া প্রয়োজন। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং সামাজিক আস্থা বৃদ্ধি পায়।
সমাজ ও রাজনীতির সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজন সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং আইন ও নীতির প্রতি শ্রদ্ধা। ব্যক্তিগত ছবি বা স্মারক ভাঙচুর কোনো সমস্যার সমাধান নয়; বরং তা বিভাজন বাড়ায়। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরও উচিত সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা। রাজনীতি আসবে-যাবে, সরকার বদলাবে; কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সম্প্রীতি টিকে থাকাই সবার কাম্য। মতভেদ থাকুক যুক্তিতে, প্রতিযোগিতা হোক উন্নয়নে, কিন্তু সম্মান ও সহাবস্থান হোক অটুট; প্রতিহিংসা রাজনীতি সমাজে স্থান পাবে না।