মো. শাহজাহান বাশার
"ইনসাফ চাই", "ন্যায়বিচার চাই"—এই দুটি শব্দ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি। রাজনৈতিক মঞ্চে, ধর্মীয় ওয়াজে, সামাজিক সভায়, টেলিভিশনের টকশোতে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিনিয়ত ইনসাফের কথা বলা হয়। কিন্তু একটি কঠিন প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই রাখা উচিত,আমরা কি সত্যিই ইনসাফের পক্ষে, নাকি শুধু নিজের স্বার্থের পক্ষে?
বাস্তবতা হলো, ইনসাফের দাবি আমরা তখনই জোরালোভাবে তুলি, যখন অন্যায়ের শিকার আমরা নিজে বা আমাদের আপনজন। কিন্তু একই অন্যায় যদি আমাদের দল, আমাদের আত্মীয়, আমাদের প্রিয় ব্যক্তি বা আমাদের পছন্দের কোনো গোষ্ঠী করে, তখন আমরা নীরব থাকি, কখনো কখনো সেই অন্যায়কেই যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করি। এখানেই আমাদের নৈতিকতার সবচেয়ে বড় সংকট।
ইনসাফ কোনো ব্যক্তি, দল বা মতের জন্য আলাদা হতে পারে না। ন্যায়বিচার মানে সবার জন্য একই মানদণ্ড। অপরাধী যদি নিজের পরিবারের সদস্যও হয়, তবুও তাকে অপরাধী বলতে পারার সাহসই প্রকৃত ইনসাফের পরিচয়। আর নির্দোষ ব্যক্তি যদি প্রতিপক্ষেরও হন, তবুও তার অধিকার রক্ষা করাই ন্যায়বিচারের মূল শিক্ষা।
আজ সমাজে বিভাজনের রাজনীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের আগে আমরা দেখি—কে বলেছে? কোন দলের? কোন মতের? তারপর সিদ্ধান্ত নিই। ফলে সত্য চাপা পড়ে যায় পরিচয়ের নিচে, আর ইনসাফ হারিয়ে যায় স্বার্থের কাছে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও ইনসাফ সর্বোচ্চ মূল্যবোধগুলোর একটি। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—প্রত্যেক ধর্মই ন্যায়, সততা ও সত্যের শিক্ষা দেয়। কিন্তু ধর্মের অনুসারী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিলেও আমরা অনেক সময় সেই শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে ধারণ করতে ব্যর্থ হই। ধর্মকে ভালোবাসার দাবি করি, কিন্তু ধর্মের ন্যায়বিচারের নির্দেশনা মানতে দ্বিধা করি।
রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, গণমাধ্যম—সবখানেই ইনসাফের প্রশ্ন আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচার যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, প্রশাসন যদি প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করে, গণমাধ্যম যদি সত্য প্রকাশে দ্বৈত নীতি গ্রহণ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু উন্নয়নে নয়, ন্যায়বিচারের ওপর মানুষের বিশ্বাসের মধ্যেও নিহিত।
আমাদের পারিবারিক জীবনেও একই চিত্র দেখা যায়। বাবা-মা অনেক সময় সন্তানদের মধ্যে সমান আচরণ করতে পারেন না। কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিবর্তে পরিচয় গুরুত্ব পায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধার চেয়ে সুপারিশ এগিয়ে যায়। সমাজে প্রভাবশালীদের জন্য এক ধরনের নিয়ম, সাধারণ মানুষের জন্য আরেক ধরনের নিয়ম কার্যকর হয়। এসবই ইনসাফের পরিপন্থী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা মুহূর্তেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করি, আবার নিজের পছন্দের কাউকে একই অভিযোগে নির্দোষ ঘোষণা করি। তথ্য যাচাইয়ের আগে আবেগ দিয়ে বিচার করার এই প্রবণতা সমাজে ন্যায়বিচারের পরিবেশকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথম পরিবর্তনটি আনতে হবে নিজের ভেতরে। আমাদের শিখতে হবে—যে অন্যায় নিজের জন্য মেনে নিতে পারি না, সেই অন্যায় অন্য কারও প্রতিও করা যাবে না। যে বিচার নিজের জন্য চাই, সেই বিচারই অন্যের জন্যও চাইতে হবে। ন্যায়বিচারের মাপকাঠি ব্যক্তি, দল বা মত অনুযায়ী বদলে গেলে সেটি আর ইনসাফ থাকে না; সেটি হয়ে যায় সুবিধাবাদ।
একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচারের ওপর। তাই ইনসাফকে শুধু বক্তৃতা, স্লোগান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটিকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে চর্চা করতে হবে—পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, রাজনীতিতে, ধর্মীয় পরিসরে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায়।
শেষ কথা একটাই—ইনসাফের কথা বলা সহজ, কিন্তু ইনসাফের পথে চলা কঠিন। সত্যিকার পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন আমরা নিজেদের স্বার্থ, দলীয় পরিচয় এবং ব্যক্তিগত আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলতে শিখব। কারণ ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। মুখে ইনসাফের স্লোগান নয়, কাজে ইনসাফের চর্চাই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের একমাত্র পথ।