নাগেশ্বরী উপজেলা প্রতিনিধি
প্রতিটি আত্মহত্যার পেছনে লুকিয়ে থাকে এক বুক নিভৃত যন্ত্রণা, যা হয়তো কোনোদিন প্রকাশ পায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর আট লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে।
অর্থাৎ, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ নিজের জীবনাবসান ঘটায়। এই প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে বদলে যায় কয়েকটি পরিবার, ভেঙে পড়ে একঝাঁক স্বপ্ন। বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরতে এবং জীবনরক্ষার এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আত্মহত্যা কেবল কোনো একক ব্যক্তি বা মানসিক সমস্যার বিষয় নয়; এটি গভীর সামাজিক ও পরিবেশগত কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। আমাদের সমাজে এখনও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করাকে একধরনের ‘ট্যাবু’ বা সামাজিক লজ্জা বলে মনে করা হয়। বিষণ্ণতা, চরম একাকীত্ব, ক্যারিয়ার বা পড়াশোনার চাপ, আর্থিক অনটন এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনের মতো বিষয়গুলো যখন কোনো মানুষকে দিশেহারা করে তোলে, তখন সে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। অথচ এই সংকটময় মুহূর্তে পর্যাপ্ত মানসিক সেবা ও সমাজ বা পরিবারের সহমর্মিতা পেলে বহু অকালমৃত্যু রোধ করা সম্ভব।
বাংলাদেশেও আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষ করে তরুণ ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। পরীক্ষার ব্যর্থতা, প্রেমজনিত সমস্যা বা পারিবারিক অবহেলার মতো কারণে বহু উদীয়মান প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, সুস্থ শরীরের মতো সুস্থ মনেরও নিয়মিত পরিচর্যার প্রয়োজন রয়েছে। একজন মানুষের কাছে জীবনের পথ যখন একদম রুদ্ধ মনে হয়, তখন তার দরকার একটু বাড়তি মনোযোগ এবং নীরব সহানুভূতি।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হলো নীরবতা ভাঙ্গা।
মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি: বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতা সম্পর্কিত কাউন্সিলিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
পরিবার ও বন্ধুদের ভূমিকা: আমাদের আশেপাশের মানুষের আচরণের পরিবর্তন (যেমন: অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যাওয়া, জীবন সম্পর্কে হতাশার কথা বলা, সামাজিক মেলামেশা থেকে পিছিয়ে যাওয়া) খেয়াল রাখতে হবে এবং তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
সহজলভ্য মানসিক সেবা: রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পর্যায়ে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ও ‘হটলাইন’ সেবার সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার।
সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা: গণমাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে এটি অন্য কারো মধ্যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে।
একটি আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা মানে একটি পুরো জীবনকে বাঁচিয়ে নেওয়া। আত্মহত্যার ভাবনা মনে আসাটা কোনো অপরাধ নয়, বরং তা একধরনের চরম
মানসিক সংকটের সংকেত।
এই সংকটে একা না থেকে সাহায্য চাওয়া এবং অন্যকে সাহায্য করাই মনুষ্যত্ব।
আসুন, বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে আমরা সবাই শপথ নিই—নিজের ও চারপাশের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখব।
যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে একে অপরের পাশে থেকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেব, যাতে অন্ধকার কেটে নতুন এক ভোরের আলো সবার জীবনে ফিরে আসে।